বাংলাদেশি ফাউন্ডারদের এখন গালফের দিকে তাকানো উচিত
গত বছর এপ্রিলে একটা খবর দেখে আমি থামলাম। ShopUp আর সৌদি B2B প্ল্যাটফর্ম Sary মিলে তৈরি হলো SILQ Group। ফান্ডিং ১১০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ১,৩০০ কোটি টাকা)। লিড করলো Sanabil Investments (PIF-এর সাবসিডিয়ারি) আর Peter Thiel-এর Valar Ventures।
বাংলাদেশের একটা কোম্পানি সৌদি সভরেন ওয়েলথ ফান্ডের ব্যাকিংয়ে গালফের সবচেয়ে বড় B2B কমার্স প্ল্যাটফর্ম হয়ে গেলো।
এটা শুধু একটা ডিল না। এটা একটা সিগন্যাল।
SILQ ডিলটা ঠিক কী
ShopUp বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় B2B কমার্স প্ল্যাটফর্ম ছিল। ছোট দোকানদারদের সাপ্লাই চেইন, লজিস্টিকস, ফাইন্যান্সিং সব একসাথে দিতো। Sary একই কাজ করতো সৌদি আরবে।
দুইটা মিলে এখন SILQ Group। ৬ লাখ+ রিটেইলার, রেস্তোরাঁ, হোলসেলারকে সেবা দেয়। প্ল্যাটফর্মে ৫ বিলিয়ন ডলারের (প্রায় ৬০,০০০ কোটি টাকা) বেশি লেনদেন হয়েছে। ৭৫০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৯,০০০ কোটি টাকা) এম্বেডেড ফাইন্যান্সিং বিতরণ করেছে।
ShopUp-এর ফাউন্ডার আফিফ জামান এখন পুরো SILQ Group-এর CEO। বাংলাদেশ থেকে একজন ফাউন্ডার গালফ আর সাউথ এশিয়া জুড়ে সবচেয়ে বড় B2B কমার্স অপারেশন চালাচ্ছে। এটা বিকাশ আর পাঠাওয়ের পরে বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মুহূর্ত হতে পারে।
ইনভেস্টর লিস্টটা দেখুন: Sanabil, Valar Ventures, Prosus, Tiger Global, Peak XV, Flourish Ventures, Qatar Development Bank। এদের কেউ চ্যারিটি করছে না। এরা একটা আসল বিজনেসে বেট ধরেছে যেটা গালফ আর ইমার্জিং এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য কানেক্ট করবে।
সাউথইস্ট এশিয়ার ক্যাপিটাল শিফট হচ্ছে
বাংলাদেশি ফাউন্ডাররা সাধারণত দুইটা প্লেবুক ফলো করে। হয় সিলিকন ভ্যালির দিকে তাকান, নাহলে সাউথইস্ট এশিয়ার দিকে। সিঙ্গাপুরে ইনকর্পোরেট করুন, SEA মার্কেট ধরুন।
পরামর্শটা পরিচিত, তাই না?
সমস্যা হলো সেই মার্কেটের অবস্থা এখন আর আগের মতো না।
২০২৫-এর প্রথম নয় মাসে সাউথইস্ট এশিয়ায় সিড ফান্ডিং নামলো ৭২%। ৩৮৬ মিলিয়ন ডলার থেকে ১১০ মিলিয়ন ডলারে (Tracxn ডেটা)। আর যে ফান্ডিং হচ্ছে, তার ৯২% একা সিঙ্গাপুর নিচ্ছে (২০২৫-এর প্রথমার্ধের ডেটা)।
ইন্দোনেশিয়া, যেটা রিজিওনের দ্বিতীয় বড় মার্কেট ছিল, পেলো মাত্র ৮%। লেট-স্টেজ ডিল হচ্ছে, কিন্তু সিড? প্রায় শুকিয়ে গেছে।
এটা হতাশার কথা না। বাস্তবতা। SEA-তে ইনভেস্টররা এখন প্রফিটেবিলিটি আর ডিপ টেক চায়। Growth-at-all-costs মডেলের দিন শেষ।
আর আপনি যদি বাংলাদেশ থেকে SEA মার্কেটে ঢুকতে চান? আপনাকে সিঙ্গাপুরে হোল্ডিং কোম্পানি খুলতে হবে, সেখানকার রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্কে ফিট করতে হবে, আর তারপরও ৯২% ক্যাপিটালের জন্য হাজারো SEA-নেটিভ স্টার্টআপের সাথে প্রতিযোগিতা করতে হবে।
কঠিন।
গালফের টাকা উলটো দিকে যাচ্ছে
এবার অন্য ছবিটা দেখুন।
সৌদি আরবে ২০২৫-এ VC ফান্ডিং হয়েছে ১.৭২ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ২০,০০০ কোটি টাকা)। আগের বছরের চেয়ে ১৪৫% বেশি। ডিলের সংখ্যা বেড়েছে ৪৫%, মোট ২৫৭টা। পুরো MENA রিজিওনে স্টার্টআপ ফান্ডিং ছিল ৭.৫ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৯০,০০০ কোটি টাকা)। Wamda-র রিপোর্ট অনুযায়ী ২২৫% গ্রোথ।
এই গ্রোথ আকাশ থেকে পড়েনি। Vision 2030-এর ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরি হচ্ছে বছরের পর বছর ধরে।
ফিনটেক সবচেয়ে ম্যাচিউর সেক্টর। ২০১৯-এ সৌদিতে লাইসেন্সড অ্যাসেট ম্যানেজার ছিল ৫টা। ২০২৫-এ ৩৬টা।
PIF-এর সাবসিডিয়ারি HUMAIN AI-তে ইনভেস্ট করছে NVIDIA AI ফ্যাক্টরিসহ ৫০০MW+ কম্পিউট ক্যাপাসিটি নিয়ে। ফিনটেক, AI, ক্লাইমেট টেক, হেলথটেক, সবখানে টাকা ঢুকছে।
২০২৫-এর প্রথমার্ধে শুধু রিয়াদের স্টার্টআপরা ১.৩৪ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১৬,০০০ কোটি টাকা) রেইজ করেছে। ৩৪২% সার্জ। ২০২৬-এ সৌদি VC মার্কেট ৩ বিলিয়ন ডলার (৩৬,০০০ কোটি টাকা) ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তুলনা করুন: বাংলাদেশের পুরো স্টার্টআপ ফান্ডিং ২০২৪-এ ছিল ৪১ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৫০০ কোটি টাকা)। ছয় বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। লোকাল ইনভেস্টমেন্ট প্রায় শূন্য, মাত্র ১১ লাখ ডলার (প্রায় ১৩ কোটি টাকা, মোটের ২%)। ৯৮% টাকা আসছে বাইরে থেকে।
আমি এটা হতাশ করতে লিখছি না। যখন নিজের দেশে ক্যাপিটাল নেই আর SEA-তে প্রতিযোগিতা অসম্ভব, তখন অন্য দিকে তাকানো বুদ্ধিমানের কাজ, হতাশ হওয়া না।
বাংলাদেশি ফাউন্ডারদের স্বাভাবিক সুবিধা আছে
মজার ব্যাপার হলো গালফ মার্কেটে বাংলাদেশি ফাউন্ডারদের কিছু সুবিধা আছে যেগুলো কোনো সিলিকন ভ্যালি ফাউন্ডার কপি করতে পারবে না।
সৌদি আরবে ২৫ লাখ বাংলাদেশি থাকে। UAE-তে আরো ৭-১০ লাখ। এটা শুধু সংখ্যা না। এটা একটা রেডিমেড ইউজার বেস।
এরা দোকান চালায়, রেস্তোরাঁ চালায়, লজিস্টিকসে কাজ করে, কনস্ট্রাকশন সাইট ম্যানেজ করে। এই মানুষদের আর্থিক সেবা দরকার। সাপ্লাই চেইন দরকার। কমিউনিকেশন টুল দরকার।
আর এদের সাথে কথা বলতে, এদের সমস্যা বুঝতে, একজন বাংলাদেশি ফাউন্ডারের যে সাংস্কৃতিক নৈকট্য আছে, সেটা কোনো পিচ ডেকে শেখানো যায় না।
SILQ ঠিক এই কাজটাই করছে। বাংলাদেশের B2B এক্সপার্টিজ আর গালফের মার্কেট সাইজ মিলিয়ে একটা সেতু তৈরি করছে।
টাইম জোনও একটা ফ্যাক্টর। ঢাকা আর রিয়াদের মধ্যে মাত্র ৩ ঘণ্টার পার্থক্য। সান ফ্রান্সিসকোর সাথে ১৩ ঘণ্টা। কার সাথে কাজ করা সহজ?
আর বাণিজ্যিক সম্পর্কের কথা তো বলাই হলো না। বাংলাদেশ থেকে গালফে গার্মেন্টস, খাদ্য, জনশক্তি রপ্তানি হয় দশকের পর দশক ধরে। এই চ্যানেলগুলো আগে থেকেই আছে। একজন ফাউন্ডার যদি এই বিদ্যমান প্রবাহের উপরে টেকনোলজি লেয়ার বসাতে পারে, সেটা নতুন মার্কেট তৈরি করার চেয়ে অনেক বেশি বাস্তবসম্মত।
কী করতে হবে
তো কী হওয়া উচিত?
প্রথমত, ডিফল্ট প্লেবুক বদলান। সিঙ্গাপুরে যাবো, SEA মার্কেট ধরবো
এটা আর ২০১৯ না। গালফ একটা সিরিয়াস অপশন, এবং অনেক ক্ষেত্রে ভালো অপশন।
দ্বিতীয়ত, সরকারি উদ্যোগগুলোকে এই দিকে নিয়ে আসুন। iDEA-র মতো প্রোগ্রাম স্টার্টআপদের গ্রান্ট আর মেন্টরশিপ দিচ্ছে। ভালো কাজ। কিন্তু এই প্রোগ্রামগুলোর মধ্যে গালফ মার্কেট অ্যাক্সেসের কম্পোনেন্ট থাকা দরকার। সৌদি আরবের অ্যাক্সিলারেটরদের সাথে পার্টনারশিপ হওয়া দরকার। রিয়াদে ডেমো ডে হওয়া দরকার।
তৃতীয়ত, আরো ক্রস-বর্ডার গল্প তৈরি হওয়া দরকার। SILQ একটা উদাহরণ, কিন্তু একটা উদাহরণ দিয়ে প্যাটার্ন তৈরি হয় না।
বাংলাদেশি ফিনটেক ফাউন্ডাররা গালফের রেমিট্যান্স মার্কেট নিয়ে কাজ করতে পারে। লজিস্টিকস ফাউন্ডাররা গালফ-বাংলাদেশ ট্রেড করিডরে টেকনোলজি আনতে পারে। এডটেক ফাউন্ডাররা প্রবাসী কমিউনিটির জন্য বিল্ড করতে পারে।
আর চতুর্থত, নেটওয়ার্ক তৈরি করুন। গালফে যারা বাংলাদেশি উদ্যোক্তা আছে, তাদের সাথে কথা বলুন। রিয়াদের স্টার্টআপ ইভেন্টে যান। সৌদি VC-দের সাথে সম্পর্ক তৈরি করুন।
এটা রাতারাতি হবে না। কিন্তু SILQ প্রমাণ করে দিয়েছে যে সৌদি ইনভেস্টররা বাংলাদেশি ফাউন্ডারদের উপর বেট ধরতে রাজি।
সামনে তাকান
আমি বার্লিন থেকে বাংলাদেশের স্টার্টআপ সিন দেখি। ভালো জিনিসও দেখি, হতাশাজনক জিনিসও দেখি। কিন্তু SILQ ডিলটা দেখে আমার মনে হয়েছে এটা সত্যিই এক্সাইটিং।
বাংলাদেশে ট্যালেন্টের অভাব নেই। বিকাশ আর পাঠাও প্রমাণ করেছে যে বড় স্কেলে প্রোডাক্ট তৈরি করা সম্ভব। ২০২৪-এ ফান্ডিং ৪১ মিলিয়ন ডলারে নেমে গেলেও সেটা ফান্ডিংয়ের সমস্যা, ফাউন্ডারদের সমস্যা না।
গালফ মার্কেটে এখন টাকা আছে, গ্রোথ আছে, আর বাংলাদেশি ফাউন্ডারদের জন্য একটা স্বাভাবিক এন্ট্রি পয়েন্ট আছে যেটা অন্য কারো নেই।
পরবর্তী SILQ হয়তো এখনই কোথাও তৈরি হচ্ছে। ঢাকার কোনো কো-ওয়ার্কিং স্পেসে। অথবা রিয়াদের কোনো অ্যাপার্টমেন্টে, যেখানে একজন বাংলাদেশি ফাউন্ডার গালফ মার্কেটের গ্যাপ দেখতে পাচ্ছে কারণ সে সেই মার্কেটে থাকে।
সেই ফাউন্ডারের জন্য টাইমিংটা এখন চমৎকার।
Comments
Leave a Comment